মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, চায়ের দেশ। সবুজে মোড়ানো এই পাহাড়ি জনপদে এবার ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। ঈদের তৃতীয় দিনে শ্রীমঙ্গলের চা বাগান, রাবার, আনারস ও লেবু বাগান, হাইল হাওর, আদিবাসী গ্রামসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে। দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগে মেতেছেন, মুগ্ধ হয়েছেন এখানকার অপরূপ শোভায়।
এবারের ঈদে লম্বা ছুটি থাকায় পর্যটকদের জন্য এটি ছিল এক দুর্দান্ত সুযোগ। অনেকেই পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে শহরের কোলাহল ছেড়ে ছুটে এসেছেন শ্রীমঙ্গলে। সোমবার (৩১ মার্চ) ঈদের দিন এবং মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) পর্যটকদের উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও, বুধবার (২ এপ্রিল) সকাল থেকেই শ্রীমঙ্গলের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, রোজার মাসে পর্যটন ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছিলেন। কোনো আয় না থাকলেও স্টাফদের বেতনসহ অন্যান্য ব্যয় বহন করা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিল। তাই এবারের ঈদে পর্যটকদের জন্য সেবার মান উন্নত করতে রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট মালিকরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ থাকা, সাজেকের অগ্নিকাণ্ডের প্রভাব এবং সেন্টমার্টিন ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার ফলে অনেক পর্যটক এবার শ্রীমঙ্গলকে ভ্রমণের গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ফলে পর্যটনের চাঙাভাব ফিরে এসেছে। ব্যবসায়ীরা আশাবাদী, ঈদের ছুটির এই পর্যটক সমাগম রমজানের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। তবে ব্যবসায়ীরা এটিও মনে করিয়ে দেন যে, দেশের অন্যান্য পর্যটন গন্তব্যে ভ্রমণের সীমাবদ্ধতা তাদের কাম্য নয়, যদিও এর ফলে শ্রীমঙ্গলের পর্যটন শিল্প লাভবান হতে পারে। তারা বিশ্বাস করেন, দেশের প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্র সমৃদ্ধ হলে সামগ্রিকভাবে পর্যটন খাত আরও বিকশিত হবে, যা সবার জন্যই কল্যাণকর।
রমজান মাস থেকেই অগ্রিম বুকিং শুরু হয়েছিল। ২৭-২৮ রমজানের মধ্যে ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে পঞ্চম দিন পর্যন্ত বুকিংয়ের জন্য প্রচুর চাহিদা দেখা যায় এবং ৭০-৮০% বুকিং সম্পন্ন হয়ে যায়। ঈদের দিন পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলের পরিবেশবান্ধব পর্যটন গ্রাম রাধানগরের প্রায় অর্ধশতাধিক কটেজ, রিসোর্ট ও হোটেলে ৯০-১০০% পর্যন্ত বুকিং হয়ে যায়। শহরের হোটেলগুলোর বুকিং তুলনামূলক কম থাকলেও ঈদের দিন পর্যন্ত ৭০-৮০% বুকিং সম্পন্ন হয়।
ঈদের দিন স্থানীয়দের ভিড়ে মুখর ছিল রেস্টুরেন্টগুলো। এরপর পর্যটকদের চাপ বাড়তে থাকে। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী খাবার, স্থানীয় আদিবাসীদের খাবার এবং বিভিন্ন বিদেশি খাবারের সমারোহ ছিল রেস্টুরেন্টগুলোতে। পর্যটকরা এসব খাবারের স্বাদ গ্রহণ করে বেশ আনন্দিত।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক তানজিলা আক্তার বলেন, “প্রথমবারের মতো পরিবার নিয়ে শ্রীমঙ্গলে এসেছি, আর আসতেই মন ভরে গেছে এর অনিন্দ্য সৌন্দর্যে। বন্ধুদের পরামর্শে রাধানগরের একটি কটেজে তিন রাতের জন্য উঠেছি, আর সত্যি বলতে, পরিবেশ, আরামদায়ক ঘর ও চমৎকার সার্ভিসের জন্য ভাড়াটাও যথাযথ মনে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে এখানকার নিস্তব্ধ প্রকৃতি—চা বাগানের সবুজের মায়া, পাহাড়-জঙ্গলের শান্ত পরিবেশ যেন এক নতুন প্রশান্তির অনুভূতি এনে দিয়েছে। শুধু একটা বিষয় একটু কষ্টদায়ক হয়েছে—অনেক আগেই চেষ্টা করেও ট্রেনের রিটার্ন টিকিট পাইনি। যদি ঢাকা-সিলেট রুটে আরও কয়েকটি ট্রেন যোগ করা হয়, শ্রীমঙ্গলের জন্য পর্যাপ্ত আসন বরাদ্দ থাকে, তাহলে ভ্রমণ আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় হতো।”
রাধানগর পর্যটন কল্যাণ পরিষদের আহ্বায়ক কুমকুম হাবিবা বলেন, “শ্রীমঙ্গলে পর্যটকদের অভূতপূর্ব সাড়া পেয়ে আমরা আনন্দিত। আমরা চাই পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বিকাশ হোক এবং পর্যটকরা প্রকৃতির ক্ষতি না করেই এই সৌন্দর্য উপভোগ করুন। আমাদের সংগঠন পর্যটকদের সহায়তা করতে সবসময় প্রস্তুত।”
শ্রীমঙ্গল ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলম বলেন, “এবারের ঈদে পর্যটকদের আগমন সত্যিই অভূতপূর্ব, যা শ্রীমঙ্গলের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করেছে। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, যাতে প্রতিটি পর্যটক সঠিক দিকনির্দেশনা ও সহায়তা পান এবং তাদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হয়। ট্যুর গাইডরা যেন পর্যটকদের জন্য শুধুমাত্র সহচর নয়, বরং শ্রীমঙ্গলের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সেতু হয়ে ওঠেন, সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তবে এবারের ঈদে দেশি পর্যটকদের ভিড় থাকলেও, বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল নগণ্য।
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল জোনের অফিসার ইনচার্জ মোঃ কামরুল হাসান চৌধুরী বলেন, “পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ভ্রমণকালীন যেকোনো সমস্যা সমাধানে ট্যুরিস্ট পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। নিরাপদ ও আনন্দদায়ক ভ্রমণের জন্য পর্যটকদের সবসময় আমাদের সহযোগিতা থাকবে।”
শ্রীমঙ্গলে ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের এই বিপুল সমাগম স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য শ্রীমঙ্গল যে সেরা গন্তব্য, তা আরও একবার প্রমাণিত হলো।