Sharing is caring!

এইচ বি রিতা
জেবুন্নেছা জোৎস্নার কাব্যগ্রন্থ ‘জলের আয়নায় আকাশ দূর চিরদিন’ ২০২৩ সালের একুশে বইমেলায় নালন্দা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। ৮৭টি কবিতা সমন্বিত এই গ্রন্থের প্রচ্ছদ শিল্পী আইয়ুব আল আমিন।
২০২৩-এ বইটি সংগ্রহ করার পর, ব্যস্ততার কারণে তা নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। তবে, দেরিতে হলেও এই কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে নিজের অনুভূতি ও বিশ্লেষণ শেয়ার করা গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো। আমি একজন সাধারণ লেখক ও পাঠক, বইটির পাঠ অভিজ্ঞতা ও মতামত অন্য পাঠকদের জন্য কতটা মূল্যবান হতে পারে তা আমার জানা নেই। তবে সাহিত্য আলোচনায় এটি নতুন দৃষ্টিকোণ যুক্ত করতে পারে বলে বিশ্বাস করি।
জেবুন্নেছা জোৎস্নার কাব্যগ্রন্থ ‘জলের আয়নায় আকাশ দূর চিরদিন’ একটি চমৎকার সাহিত্যকর্ম, যা প্রথাগত ছন্দের বাইরে মুক্ত ছন্দে লেখা হয়েছে। তাঁর কবিতায় অদ্ভুত এক বৈজ্ঞানিক চেতনার প্রবাহ লক্ষ্যণীয়, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণাগুলো তাঁর সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে মিশে যায়। এভাবেই কবি যুক্তি ও হৃদয়ের অনুভূতি একত্রিত করে কবিতাগুলোর মধ্যে নিজস্ব এক ভাষা তৈরি করেছেন। বলা যায়, এটি এক ধরনের আবেগের বিপরীতে স্থিতির অনুসন্ধান যা আমাকে নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে আরো একবার ভাবতে বাধ্য করেছে। কিছু কবিতা একবার পড়েই বোঝা সম্ভব হয়নি, হয়তো পাঠক হিসাবে এ আমার ব্যর্থতা। তবে এটা সত্য যে, একটা কবিতার শত ব্যাখ্যা দাড় করালেও হয়তো পাঠক হিসাবে আমি কখনোই কবির ভেতরের মূল ভাবনা ও বার্তাটাকে সম্পূর্ণরূপে উপস্থাপন করতে পারবো না। তবু চেষ্টা করা।
জেবুন্নেছা জোৎস্নার প্রথম কবিতা “অসুখ।”
‘পদ্য বিক্রির বাহানায় কবি জীবিকার সন্ধানে-
রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার দাঁত;
পুড়ছে পৃথিবীর ফুসফুস আ্যামাজনের আগুনে-
লুণ্ঠিত মানবিকতায় দ্রোহের অভিসম্পাত।’
সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে কবিদের জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা যা শিল্পীর আর্থিক সংগ্রামের এক চিত্র। দ্বিতীয় পঙ্তিতে ‘দাঁত’ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত প্রভাবকে তুলে ধরে, যা সমাজে বিভাজন ও সংঘর্ষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তৃতীয় পঙ্তিটি আমাজন রেইনফরেস্টে সংঘটিত দাবানলের প্রতি ইঙ্গিত করে, যা পৃথিবীর পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এর পরের পঙ্তিতেই কবি লিখেছেন , ‘লুণ্ঠিত মানবিকতায় দ্রোহের অভিসম্পাত’-যা মানব সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে। কবি আ্যামাজনের আগুনে পোড়া পরিবেশ ধ্বংসের মতোই মানবিক মূল্যবোধের পতন ঘটছে বলে বার্তা দিয়েছেন; যা কবির মনে দ্রোহ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা, বিপর্যয় এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়—এই সবকিছু মিলিয়ে কবি সমাজের গভীর অসুখকে চিহ্নিত করেছেন এই কবিতায়।
‘মনুষ্যহীনতার বধ্যভূমিতে
থমকে যায় পৃথিবীর সৌন্দর্য-
বিষাক্ত ইকোলজির বুদবুদে ভাসমান কদর্যতায়
কলঙ্কিত চন্দ্র-সূর্য, মেঘ বৃষ্টির সুষমা’ (অর্ধেক মানুষ)
‘ম্যাগনোলিয়ার সুগন্ধি ভালোবাসা যেদিন আমায় ডাকে
তুমি তখন নৈঃশব্দ্যের দেয়ালে ব্যস্ত বিচিত্র রাত্রি আঁকতে।’ (কৃষ্ণ গহব্বর)
‘জীবন মৃত্যুর সন্ধ্যা দ্যুতি ক্ষণে
কার্বন অক্সিজেনের ইকুইলিব্রিয়ামে যে সাঁকোটি দুলছে
আমি সেই ভেন্টিলেটরে
যেন একটি কবিতা চূরান্ত শেষের অপেক্ষায়..’ (লাস্ট সানসেট),
‘সাদা মানুষ থেকে তুলে আনি তার সফেদ পাতলা চামড়া
আর কালো মানুষের শরীরের মেলানিন পিগমেন্টগুলো’
(অ্যালবেনিজম)
উল্লিখিত কবিতাংশগুলোতে কিছু শব্দের ব্যবহার রয়েছে,
যেমন-ইকোলোজি(জীববিজ্ঞানের শাখা), কার্বন অক্সিজেনের ইকুইলিব্রিয়াম (পরিবেশবিজ্ঞানের শব্দ), অ্যালবেনিজম (জৈবিক ও চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কিত শব্দ), ভেন্টিলেটর (চিকিৎসাবিজ্ঞানের শব্দ) মেলানিন পিগমেন্ট-(মেলানিন-মেলানোসাইট কোষ থেকে উৎপন্ন হয় যা জীববিজ্ঞানের শব্দ)।
এর পাশাপাশি প্রতীকী ও পৌরাণিক মিশ্রণ প্রায়শই তাঁর কবিতায় উঠে আসে যা তাঁর সৃষ্টিশীলতার ভিন্ন এক পরিচয় বহন করে, এবং মানবিক অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে কবির আন্তঃসংযোগ স্থাপন করে। এটাই কবির স্বতন্ত্রতা।
তাঁর এমনই একটি চমৎকার কবিতা “নরকের দরজা”, যেখানে প্রথম পাঁচটি চরণ-
‘প্রাক-ঐতিহাসিক যুগের ব্যাবিলনের বালুর নিচে
পেট্রোগ্লিফের বৃত্তটি এতদিন শূন্যই ছিলো।
শাখা-প্রশাখায় এটি অনায়াসে মিশে যেত
স্টাইক্স নদীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে, ফেরিম্যান চ্যারন
যেখানে মৃত আত্মাদের সাথে নিয়ে চলে যেত জাহাজ।’
উল্লিখিত কবিতাংশে বেশ কয়েকটি বিশেষ শব্দ ও প্রতীক ব্যবহৃত হয়েছে, যা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রসঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। ‘ব্যাবিলনের বালুর নিচে পেট্রোগ্লিফের বৃত্ত’-পেট্রোগ্লিফ প্রাচীন মানুষের তৈরি পাথরের উপর খোদাই করা চিত্র বা প্রতীক এবং এটি যোগাযোগের প্রাচীনতম রূপগুলির কিছু যা সময়ের সাথে হারিয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে, গ্রিক পুরাণে আন্ডারওয়ার্ল্ড বা পাতালের পাঁচটি নদীর একটি স্টাইক্স (যা আমেরিকান উচ্চারণে কখনো স্ট্যাক্স কখনো স্টিক্স)। গ্রিক বিশ্বাসে মৃত্যুর পরে মানুষের আত্মাকে মৃত্যু দেবতা থানাটস এই নদীর তীরে পৌঁছে দেন। স্টাইক্স ও অ্যাখেরন নদী পার হয়েই তবে আত্মাটি আণ্ডারওয়ার্ল্ডে প্রবেশ করতে পারে। আর মৃত আত্মাদের নদী পার করে দেয়ার জন্যে সেখানে একটি নৌকা ও একটি বৈঠা নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন ফেরিওয়ালা চ্যারন। যদিও গ্রিক মিথোলোজির রেফারেন্সে চরিত্রের ক্ষেত্রে এটির উচ্চারণ ‘হারন(Charon) এবং আমেরিকান উচ্চারণে ‘ক্যারন’, তবে ‘ড্ওর্ফ গ্রহ প্লুটোর পাঁচটি প্রাকৃতিক উপগ্রহের বর্ণনায় এটির উচ্চারণে আসে ‘শ্যারন।’ অর্থাৎ ক্ষেত্র বিশেষে শব্দটির উচ্চারণ পরিবর্তিত হয়।
এই কবিতাটির শেষের চরণে কবি লিখেছেন,
‘পাখির কাফেলার পিছু নিয়ে একদিন
মানুষেরাও দাম্ভিকতায় পৌঁছে যায় বৃত্তে
খনিত বৃত্তের খনিজ মেহনের স্খলনে
যায় খুলে নরকের দরজা-
কারাকুম মরুভূমির দারভাজা গ্যাস ক্রেটারে।’
কবিতার এই চরণগুলোতে কবি মানবজাতির অতিরিক্ত লোভ ও দাম্ভিকতার ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ‘পাখির কাফেলার পিছু নিয়ে একদিন মানুষেরাও দাম্ভিকতায় পৌঁছে যায় বৃত্তে’—এখানে ‘কাফেলা’ উষ্ট্রারোহী তীর্থযাত্রীদল, আর ‘মানুষের দাম্ভিকতা’ শব্দটি অহংকার বা আত্মমর্যাদার অতিরিক্ত প্রদর্শন বোঝায়। এটি এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে ব্যক্তি নিজেকে অন্যদের তুলনায় উচ্চতর বা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং প্রায়ই অন্যদের তুচ্ছ করে দেখে। কবি বোঝাতে চাচ্ছেন যে, মানুষের অতিরিক্ত অহংকার বা লোভ একসময় তার পতন বা বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ‘খনিত বৃত্তের খনিজ মেহনের স্খলনে’—এটি প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত উত্তোলন ও ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়কে নির্দেশ, যার ফলে ‘নরকের দরজা’ বা ‘কারাকুম মরুভূমির দারভাজা গ্যাস ক্রেটার’-এর মতো বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, যা মানবজাতির জন্য একটি সতর্কবার্তা।
কবি তার চমৎকার শব্দচয়ন, বাক্যগঠন ও প্রতীকী রূপকের মাধ্যমে আমাদের অতিরিক্ত অহংকার ও দাম্ভিকতার ফলে জীবনের ক্ষণস্থায়ীতা ও অস্থিরতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, এই পৃথিবীতে আমাদের সময় সীমিত এবং আমাদের কর্মকাণ্ডের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত।
কবি জেবুন্নেছা জোৎস্নার কবিতায় কঠিন শব্দ, জটিলতা এবং বৈজ্ঞানিক উপাদান প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়। কিছু পাঠক তাঁর কবিতাকে দুর্বোধ হিসেবে অভিহিত করেন, তবে লেখক নিজে এটি খোলসা করেছেন তার চিন্তা ও ভাবনার সাথে, পাঠকের বোঝার ক্ষমতার সাথে নয়। তাঁর কবিতাগুলি গূঢ়তা, প্রতীকবাদ, প্রতিবাদী এবং রহস্যে পূর্ণ, যা পাঠককে ভাবনার জগতে ডুবিয়ে রাখবে।
জেবুন্নেছা জোৎস্নার এমন অসংখ্য কবিতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি বলব, একজন কবি হিসাবে তিনি একটা নিজস্ব কণ্ঠস্বর তৈরি করতে পেরেছেন, যা যে কোনো সময় যে কেউ পড়লেই বুঝতে অসুবিধা হবে না যে, এটি জেবুন্নেছা জোৎস্নারই লেখা কবিতা। এবং এমনটাই তৈরি করে গেছেন আমাদের অতিতের বিজ্ঞ প্রতিভাবান কবিরা।
জেবুন্নেছা জোৎস্নার কাব্যগ্রন্থ ‘জলের আয়নায় আকাশ দূর চিরদিন’ আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণা, প্রতীকী উপাদান ও পৌরাণিক উপাদানের মিশ্রণে গঠিত একটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। গ্রন্থের কবিতাগুলো মুক্ত ছন্দে রচিত, যেখানে ব্যক্তি ও সমাজের বিভিন্ন সংকট নিয়ে তীব্র দ্রোহের প্রকাশ লক্ষণীয়। এই বইটি শুধু সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা নয়, এটি এক ধরনের মানসিক যাত্রা, যেখানে বিজ্ঞান এবং শিল্প এক সেতু নির্মাণ করেছে। যদিও জেবুন্নেছা জোৎস্নার কবিতা এমন এক স্তরে পৌঁছেছে যা সাধারণ পাঠকের জন্য কখনও কখনও কঠিন হতে পারে। কিন্তু যারা গভীর চিন্তা ও বিশ্লেষণ করতে চান, তাদের জন্য এটি এক অমূল্য রত্ন। কবির জন্য শুভ কামনা।