আজ শনিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

যে কারণে মাঠে নামতে পারে বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলো

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ৪, ২০২৫, ০৪:৩৮ অপরাহ্ণ
যে কারণে মাঠে নামতে পারে বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলো

Sharing is caring!

টাইমস নিউজ 

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে ভোটের প্রতি জনমনে উৎসাহ সৃষ্টি ও মাঠের চাপ তৈরির পরিকল্পনা করছে বিএনপি ও রাজনৈতিক দলগুলো। তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনও আলোচনা হয়নি।

কমিটির কোনও-কোনও সদস্য শীর্ষ নেতৃত্বের পরামর্শে কর্মসূচির বিষয়ে প্রকাশ্যে মত দিলেও আদতে দলের কৌশলে ভিন্নতা থাকছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ একাধিক ইস্যুতে কর্মসূচি দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক। মূলত নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরোধিতার কোনও সুযোগ নেই বলে কর্মসূচি নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশও রয়েছে দলের নেতাদের।

স্থায়ী কমিটির এক সদস্য শুক্রবার (৪ এপ্রিল) বলেন, ‘কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলাপ করতে হলে বুঝতে হবে সেটা মানুষ একসেপ্ট করবে কিনা। সর্বশেষ রোজা ও রোজার ঈদে মানুষ সরকারের ওপর সন্তুষ্ট। বাজারের দরদাম, ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ ছিল, এটা বাস্তব। এক্ষেত্রে বিএনপিকে হিসাব করেই এগোতে হবে।’

দলের আরেক সদস্য মনে করেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এক্ষেত্রে ইস্যু যেন নির্বাচনের বাইরে না যায়, সেদিকেই মনোযোগী বিএনপি। কোনোভাবেই যেন নির্বাচনের পথ থেকে সরকারের মূল মনোযোগ না সরে, সেটিকে খেয়াল করছে বিএনপি।’

ইতোমধ্যে লন্ডনে ঈদের দিন রাতে ভার্চুয়ালি সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশনা দেন। ‘আপনারা অনেক কষ্ট করেছেন, গণতন্ত্রের স্বার্থে আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার’— পরামর্শ দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি সেদিন বলেন, ‘আগামীতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। একে অপরকে সহযোগিতা করতে হবে। সবাই মিলে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

ওই শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উল্লেখ করেন, ‘আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ঢাকায় এসে নেতৃত্ব দেবেন।’

দলের মধ্যে আলোচনা আছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে-পরে দেশে ফিরবেন ১৫ বছর ধরে দেশের বাইরে থাকা তারেক রহমান।

শুক্রবার আলাপকালে এই প্রতিবেদককে দলের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল জানান, মূলত নির্বাচনসহ একাধিক ইস্যুতে কর্মসূচি দিতে বিএনপির ওপর চাপ রয়েছে। একইসঙ্গে মাঠে সক্রিয় থাকা এবং সংগঠনকে চাঙ্গা রাখার কৌশল থেকে সম্ভাব্য কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে বিএনপি। তবে কৌশলগত কারণে সরকারের বিরুদ্ধে এই কর্মসূচি হচ্ছে না। নির্বাচনের দাবিতে হলেও কর্মসূচির ধরনে সমাবেশই প্রাধান্য পাচ্ছে। একইসঙ্গে সমমনা দলগুলোকেও নির্বাচনি দাবিতে সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে বিএনপি।

দলের একজন প্রভাবশালী দায়িত্বশীল বলেন, ‘বিএনপির প্রতিপক্ষ অনেক। সরকারের ভেতরেও একটি পক্ষ রয়েছে। বাইরে জামায়াতসহ বিভিন্ন শক্তি রয়েছে। অদৃশ্যভাবে সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও রয়েছে।’

‘নির্বাচনের বিরুদ্ধে আভাস আসছে। কর্মসূচিতে গেলে কাউন্টার কর্মসূচি হলে বিচ্ছিরি হবে‘, বলেন তিনি।

স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘ড. ইউনূস যেভাবে ভারতের সঙ্গে ডিল করছেন, তাতে দেশের অভ্যন্তরে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক অবস্থান শক্ত হচ্ছে। ফলে, সরকারের কাছে কোনও দাবি আদায়ে কর্মসূচির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু শুক্রবার রাতে বলেন, ‘আমরা এখনও প্রত্যাশা করি— বর্তমান অন্তবর্তী সরকার নির্বাচনের রোডম্যাপ দেবে। সেই রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচন হবে। আজ ব্যাংককেও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন, নির্বাচনই তার সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার। সবচেয়ে বড় কথা, কোনও সরকারের লিমিটেশন যাই থাকুক; তারা কিন্তু বলেছেন— ডিসেম্বর থেকে নির্বাচনের সম্ভাবনার কথা। ফলে সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

সরকারের সঙ্গে যুক্ত একটি ঘনিষ্ঠসূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন যথাসময়ে দিতে প্রধান উপদেষ্টার আন্তরিকতা থাকলেও বাইরে দেশি-বিদেশি পক্ষ ও দেশের দুই-তিনটি রাজনৈতিক শক্তি কোনও পক্ষের পরামর্শে নির্বাচন পেছানোর পক্ষে সরকারের ভেতরেরই একটি অংশ। সেক্ষেত্রে বিএনপিকে এই বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

বিএনপির সঙ্গে বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনে যুগপতভাবে থাকা একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান জানিয়েছেন, নির্বাচন নিয়ে ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের যে সময়সীমা বলা হচ্ছে, সেটি নিয়েও বিএনপির সন্দেহ আছে। এ কারণে ইতোমধ্যে বিএনপির শীর্ষনেতারা যুগপতে যুক্ত দলগুলোর সঙ্গেও নির্বাচন নিয়ে মাঠের চাপ তৈরি করতে কর্মসূচি দিতে প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন।

গণতন্ত্র মঞ্চের একজন অন্যতম নেতা বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য মাঠের চাপ সৃষ্টি করতে হবে। বিএনপিও চায় সেদিকে যেতে। বিএনপিও অস্পষ্ট রয়েছে, নির্বাচন আসলে কবে নাগাদ হতে পারে। এমনকী সরকার নির্বাচন এ বছর না দিয়ে বিলম্ব করবে, এমন সন্দেহ খোদ বিএনপির উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সেই চিন্তা থেকেই কর্মসূচির চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে।

আগামী সোমবার (৭ এপ্রিল) স্থায়ী কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে এ সংক্রান্ত আলোচনা হতে পারে, এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন একজন নেতা।

শুক্রবার রাতে এ প্রসঙ্গে আলাপকালে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা সাইফুল হক বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য আমাদের মাঠের কর্মসূচিতে যেতে হবে, এটা অনাকাঙ্ক্ষিত, বিব্রতকর। সরকার যদি নির্বাচনের বিষয়টিকে অনিশ্চিত রেখে দেয়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোকে মাঠের কর্মসূচির চিন্তা করতে হবে। মাঠের কর্মসূচি ছাড়া গোটা ভোট, যথাসময়ে নির্বাচন আদায় হবে, এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে অনাকাঙ্ক্ষিত।’

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক আশা করেন, নির্বাচনের জন্য মাঠের কর্মসূচিতে যাওয়ার দরকার হবে না।

তিনি মনে করেন, সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। সরকার এই বিষয়টি বিবেচনা করে রাজনৈতিক দলগুলোকে আশ্বস্ত করবেন, নির্বাচনের সমন্বিত কর্মসূচি প্রকাশ করবেন।

নির্বাচনের জন্য কর্মসূচিতে গেলে ‘কাউন্টার কর্মসূচি’র আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন কোনও-কোনও নেতা। এই ক্ষেত্রে নতুন গঠিত দল, জামায়াতসহ একাধিক পক্ষের ইন্ধনে নির্বাচনের বিরুদ্ধেও মাঠে দাবি আসতে পারে। সেক্ষেত্রে ‘বিচ্ছিরি ব্যাপার’ ঘটতে পারে, বলে আগাম সতর্ক থাকা দরকার, বলে জানান একটি দলের প্রধান।

জানতে চাইলে আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের ব‍্যাপারে এবি পার্টির অবস্থান শুরু থেকেই খুব স্পষ্ট। আমরা বিশ্বাস করি, এ তিনটি কাজ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী দুই-তিন মাসের মধ্যে শেষ করতে পারবে। সরকার নিজেও এই ব্যাপারে বলেছে ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে তারা নির্বাচন আয়োজন করতে প্রস্তুত।’

‘তাহলে আন্দোলন করে নির্বাচন আদায় করার কোনও যৌক্তিক কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। বরং এতে ভুল বোঝাবুঝি ও দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে’, মনে করেন এবি পার্টির শীর্ষনেতা। তিনি উল্লেখ করেন, ‘‘অন‍্য একটি পক্ষ যদি ‘এ মুহূর্তে নির্বাচন নয়’ এরকম পাল্টা আন্দোলনের ডাক দেয় তখন পরিস্থিতি অযথা জটিল হয়ে পড়তে পারে।’’